মোঃ তোফাজ্জল মিয়া, চুনারুঘাট : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, চুনারুঘাট থানার সামনে দুই তরুণী এক যুবককে ধর্ষক বলে চিৎকার করছেন এবং জুতা দিয়ে মারধর করছেন। এ ঘটনায় তরুণীদের পরিচয় ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
পরিবারের দাবি, ওই দুই তরুণী চুনারুঘাট উপজেলার দেওরগাছ ইউনিয়নের আজিমাবাদ গ্রামের আব্দুল নূরের মেয়ে সুমি আক্তার (২৬) ও তাঁর ছোট বোন। সুমি আক্তারকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে এক যুবককে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।
চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে বিপত্তি, সহায়তার আশ্বাসে বিপদে
ঘটনার বিবরণ দিয়ে সুমির বড় ভাই মাসুম আহমেদ জানান, তাঁর দুই বোন সুমি আক্তার ও ছোট বোন অলিপুরের প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিতে চাকরি করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় এক বছর আগে সুমি চাকরি ছেড়ে দেন। পরে আর্থিক সংকটের কারণে গত ৭ অক্টোবর সুস্থ হয়ে পুনরায় চাকরিতে যোগ দিতে ওই কোম্পানিতে যান।
মাসুমের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানিতে প্রবেশের সময় সুমি দেখতে পান, তাঁর আগের ফিঙ্গারপ্রিন্টের তথ্য রয়ে গেছে। পুনরায় চাকরিতে যোগ দিতে হলে সেটি মুছে ফেলার প্রয়োজন ছিল। এ সময় কোম্পানিতে কর্মরত এক যুবক বিষয়টি লক্ষ্য করে সুমির কাছে আসেন এবং এ কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ওই যুবক জানান, শায়েস্তাগঞ্জে তাঁর এক বন্ধুর কম্পিউটারের দোকান রয়েছে, সেখানে গেলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
পরিবারের অভিযোগ, এরপর ওই যুবক সুমিকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠতে বলেন। চলন্ত অবস্থায় রাস্তা থেকে আরও এক যুবক ওই সিএনজিতে ওঠেন, যাঁর হাতে ধারালো চাকু ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে সিএনজিটি একটি নির্জন জঙ্গলে ঘেরা চা-বাগান এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। জায়গাটি সুমির অপরিচিত ছিল।
মাসুম আহমেদের অভিযোগ, সেখানে প্রথমে ওই যুবক এবং পরে আরও পাঁচজন মিলে সুমিকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেন। পরে প্রথম যুবকই তাঁকে অন্য একটি সিএনজিতে তুলে দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর দাবি পরিবারের
মাসুম আহমেদ জানান, অভিযুক্ত প্রথম যুবকের নাম সম্ভবত বাছির। তাঁর বাড়ি লালচাঁন এলাকায় হতে পারে এবং তিনি প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির বলপেন শাখায় কাজ করেন বলে পরিবারের ধারণা। তবে অভিযুক্তের পূর্ণ পরিচয় এবং অন্য পাঁচজনের পরিচয় সম্পর্কে সুমি নিশ্চিত ছিলেন না বলে জানান তিনি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমি ঘটনার কথা জানানোর পর গত ৮ অক্টোবর তাঁকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণ-সংক্রান্ত পরীক্ষা করানো হয়েছে এবং পরীক্ষায় ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন মাসুম। তবে এ বিষয়ে হাসপাতালের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছোট বোনের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে শনাক্তের দাবি
মাসুম আহমেদ আরও জানান, পরবর্তীতে খোঁজখবর নিয়ে তাঁরা প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিতে ওই যুবকের সন্ধান পান। এরপর তাঁকে শনাক্ত ও আটক করানোর উদ্দেশ্যে সুমির ছোট বোনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল নেওয়া হয় বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের দাবি, ওই যুবক জানতেন না যে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা তরুণী সুমির ছোট বোন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসে চুনারুঘাট থানার সামনে পৌঁছালে সুমি ও তাঁর ছোট বোন ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তাঁকে জুতা দিয়ে মারধর করেন। পরে সেখান থেকেই পুলিশ তাঁকে আটক করে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি, তদন্ত করছে পুলিশ
মাসুম আহমেদ বলেন, তাঁরা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থানায় মামলা দায়ের করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে চুনারুঘাট থানা পুলিশ তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে চুনারুঘাট থানায় যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে থানায় অতিরিক্ত চাপ থাকলেও ঘটনার তদন্ত এবং অভিযোগকারী পক্ষের মামলা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান
মাসুম আহমেদ অভিযোগ করেন, ঘটনার প্রকৃত বিবরণ না জেনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মানুষ আংশিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন, যা তাঁদের জন্য বিব্রতকর। তিনি জানান, এ পর্যন্ত তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংবাদ সম্মেলন বা প্রেস ব্রিফিং করেননি। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে জানা যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে পুরো ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন। অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, অন্য পাঁচজনের পরিচয় এবং ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে পুলিশের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষা রয়েছে।


