নিউজ ডেস্ক: চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (৫০ শয্যাবিশিষ্ট) প্যাথলজি বিভাগে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও দরিদ্র রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেককে যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। তবে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে নাকি অন্য কোনো কারণে পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, প্যাথলজি বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনোলজিস্ট মো. সজীব মিয়া উপস্থিত নেই। ফলে পরীক্ষা করাতে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে রোগীদের।
এ বিষয়ে ল্যাব টেকনোলজিস্ট মো. সজীব মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গত ২ নভেম্বর আবু বকর নামে এক ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়েছেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত তিনি ল্যাবে ফিরবেন না।
সজীব মিয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, আমি নাকি ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছি। এটি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে। আমার রিপোর্ট ভুল প্রমাণিত হলে প্রয়োজনে আমি চুনারুঘাট থেকে বদলি হয়ে যাব। এটি আমার চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কেউ যদি ষড়যন্ত্র করে অন্য ব্যক্তির নমুনা সরবরাহ করেন, তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আবু বকরের স্ত্রীর পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিষয়ে সজীব মিয়া বলেন, গত ২৭ অক্টোবর তাঁর স্ত্রীর নামে CBC, WIDAL ও URIN—এই তিনটি পরীক্ষার নমুনা দেওয়া হয়। সেই নমুনার ভিত্তিতেই তিনি পরীক্ষা করে রিপোর্ট প্রদান করেন। নমুনা সংগ্রহের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কে, তা তিনি যাচাই করেন না; বরং সরবরাহ করা নমুনার ভিত্তিতেই পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
তিনি আরও বলেন, পরদিন ২৮ অক্টোবর আবু বকর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পুনরায় পরীক্ষা করান। সেখানে WIDAL পরীক্ষার ফলাফলে সরকারি হাসপাতালের রিপোর্টের তুলনায় পয়েন্ট কম আসে। এরপর কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়েই তিনি মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বলে দাবি সজীব মিয়ার।
সজীব মিয়ার ভাষ্য, রিপোর্টের তারিখন মুনা এবং পরীক্ষার সময়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। CBC ও URIN পরীক্ষাতেও কিছু বিষয় ছিল। শুধু পয়েন্ট কম-বেশি হওয়ার ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট ভুল এবং অন্যটি সঠিক এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। WIDAL পরীক্ষা এককভাবে টাইফয়েড নিশ্চিত করে না। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও জানান, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে আবু বকর হাসপাতালের টিএইচও মোজাম্মেল হক ও চিকিৎসক সাইদ ইমরানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সজীব মিয়া বলেন, ২০১৬ সালে তিনি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বায়োকেমিস্ট্রিতে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগের মাধ্যমে ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি হয়। চুনারুঘাট হাসপাতালে যোগদানের পর বিভিন্ন সংকট কাটিয়ে ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালু হয় বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, বর্তমানে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী স্বল্পমূল্যে এখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা পাচ্ছেন এবং সরকারও এ খাত থেকে প্রতিমাসে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পাচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে আসা রোগীরা জানান, বেসরকারি ক্লিনিকের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে অনেক কম খরচে পরীক্ষা করানো যায়। কোনো কোনো পরীক্ষায় খরচ চার থেকে পাঁচ গুণ কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তি। তাই পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাঁরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা চালু হওয়ায় বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যেতে পারে। এ কারণে পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটিতে এমনিতেই জনবল সংকট রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন কারণে এক্সরে ও ইসিজি মেশিন বছরের পর বছর অকেজো পড়ে ছিল। নতুন করে চালু হওয়া পরীক্ষার কার্যক্রমও যেন কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে বন্ধ না হয়ে যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চিকিৎসক ডা. সাইদ ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি নিজে রিপোর্টটি দেখেছেন। তাঁর মতে, পরীক্ষায় কোনো ভুল ছিল না। টাইফয়েড-সংক্রান্ত WIDAL পরীক্ষায় ফলাফলের তারতম্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) মোজাম্মেল হক জানান, তিনি রোগীকে দেখেছেন। রোগীর শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল এবং রিপোর্টও সঠিক ছিল বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। আবু বকর তাঁর স্ত্রীকে যে বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করিয়েছেন, সেখানকার রিপোর্ট সরকারি হাসপাতালের রিপোর্টের চেয়ে কিভাবে নির্ভুল তা তিনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন আমি জানি না ।
তিনি আরও বলেন, ল্যাব টেকনোলজিস্ট সজীব মিয়া এ বিষয়ে বিচারের জন্য তাঁর কাছে এসেছেন। বিষয়টি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ফয়সল আহমেদের কাছে অবহিত করবেন। এ বিষয়ে কমিটি যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। ব্যক্তিগত অভিযোগের সত্যতা যাচাই, রিপোর্টের নির্ভুলতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিসবকিছুই হওয়া প্রয়োজন যথাযথ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু এর প্রভাব যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর না পড়ে, সেটিই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
জনমনে এখন বড় প্রশ্ন একটি রিপোর্ট নিয়ে বিতর্কের জেরে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে কেন? অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের স্বার্থে দ্রুত প্যাথলজি বিভাগের সেবা চালু করা হবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন চুনারুঘাটবাসী।


