নিজস্ব প্রতিবেদক: চুনারুঘাটে এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষার হলে শিক্ষককে মারধর ও গলা চেপে ধরার অভিযোগে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভুক্তভোগী শিক্ষক মোহাম্মদ আল আমিন চুনারুঘাট থানায় এ মামলা করেন। এদিকে, বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষ থেকে অভিযুক্তের পালিয়ে যাওয়া এবং তাকে পালাতে একটি চক্র সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
শনিবারের মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলে পুনরায় মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ঘটনাটি উপজেলার গাজীপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ইংরেজি প্রথম পত্রের নির্বাচনী পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ফারহান খান ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ মিনিট পর সে পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আল আমিন তার প্রবেশপত্র দেখতে চাইলে সে তা দেখাতে পারেনি। তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে ফারহান অন্য পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কলম নেওয়ার চেষ্টা করে, অনুমতি ছাড়া আসন পরিবর্তন করে এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করে উত্তর দেখে পরীক্ষার খাতায় লিখতে থাকে। এ সময় শিক্ষক তার মোবাইল ফোন নিয়ে তাকে নির্ধারিত আসনে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে উত্তেজিত হয়ে শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং কিল-ঘুষি মারে। একপর্যায়ে হত্যার উদ্দেশ্যে শিক্ষকের গলা চেপে ধরে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে পরীক্ষাকক্ষে থাকা অন্য পরীক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে শিক্ষককে রক্ষা করে। এ ঘটনায় পরীক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যরা অভিযুক্তকে বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে আটকে রাখেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশকে জানানো হয়।
পরে উপজেলা প্রশাসন ও চুনারুঘাট থানা পুলিশের সদস্যরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু অফিসকক্ষের তালা খুলে দেখা যায়, জানালা খোলা এবং অভিযুক্ত সেখানে নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, সে কৌশলে জানালা দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত কীভাবে অফিসকক্ষ থেকে পালিয়ে গেল, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং তাকে পালাতে কেউ সহযোগিতা করেছে কি না এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অভিযুক্তকে পালাতে একটি চক্র সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই চক্রে কারা জড়িত, কীভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিক্ষককে মারধরের অভিযোগের পর অভিযুক্তকে আটকে রাখা এবং পরে তার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়, এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রশাসন ও পুলিশ পৌঁছানোর পর অভিযুক্ত কীভাবে পালিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্নো উঠেছে।
এদিকে, অভিযুক্তের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার (৩১ অক্টোবর) এর মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলে তারা আবারও মানববন্ধন করবেন।
শিক্ষার্থীদের এ ঘোষণায় বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় ও স্থানীয় এলাকায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যেন নতুন কোনো সংঘাতের দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনের পদক্ষেপ কামনা করেন তারা।
শিক্ষকের ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা এবং পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারও সহযোগিতা বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মামলার তদন্তের অগ্রগতি ও অভিযুক্তের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষা রয়েছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


